বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৪ পূর্বাহ্ন
মশিউর রহমান ,ফরিদগঞ্জ প্রতিনিধি:
একদা অর্থ, প্রতিপত্তি ও সামাজিক প্রভাবে শিখরে থাকা ফরিদগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রূপসা জমিদার পরিবার কালের আবর্তে কিছুটা জৌলুস হারালেও, সেই হারানো ঐতিহ্য ও যশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজে নতুন প্রজন্মের দায়িত্বশীলতা এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। পরিবারের বর্তমান বংশধর সৈয়দ মেহেদী হাছান চৌধুরী কেবল প্রাচুর্য দিয়ে নয়, বরং মানবিকতা, শিক্ষা এবং সমাজসেবার মাধ্যমে পরিবারটির কিঞ্চিৎ হারানো খ্যাতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অবিরাম কাজ করছেন।
ফরিদগঞ্জের মেঘনার পূর্বপাড়ের সর্ববৃহৎ এই জমিদার বাড়ি এখন আর কেবল অর্থের মাপকাঠিতে বিচার করা হয় না, বরং সামাজিক সেবার মাধ্যমে এর মূল্যায়ন হচ্ছে। এককালে এই পরিবার প্রজাহিতৈষী এবং সমাজসেবামূলক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত ছিল।
মেঘনা পাড়ের সমৃদ্ধশালী অঞ্চল চাঁদপুরের গৌরবময় ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই জমিদারবাড়ি ও পরিবারের ইতিহাস। এ অঞ্চলে অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ, জনহিতকর কাজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ছিলেন রূপসার জমিদাররা। জমিদারি প্রথা থাকাকালীন প্রজাদের খাজনার টাকায় ভোগ বিলাস না করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, মসজিদ-মাদ্রসাসহ অনেক কিছুই স্থাপন করে গেছেন তারা।
চাঁদপুর শহর থেকে প্রায় ২৫/৩০ কিলোমিটার দূরে ফরিদগঞ্জ উপজেলা সদরের অদূরেই রূপসা বাজারের পশ্চিম দক্ষিণ কোনে নজর দিলেই দৃষ্টিতে পড়বে জমিদারবাড়ির সিংহদ্বার। পাশেই কারুকার্জ খচিত একটি মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণ পাশে একটি কবরস্থান। এর প্রতিটি ফলকে লেখা রয়েছে চিরনিন্দ্রায় শায়িত ব্যক্তিদের সুকর্মের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। পথ ধরে সামনে এগুলেই চোখে পড়বে ঘাঁট বাঁধানো দীঘি। সামনেই নজরে পড়বে জমিদারবাড়ির ঐতিহ্যমণ্ডিত বাড়িটির প্রধান ফটক ও কাছারি।
প্রায় তিনশ’ বছর আগের কথা। আঠারো শতকের মাঝামঝি সময়ে রূপসার জমিদারদের গোড়াপত্তন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গৌরব সামাণ্য ম্লান হলেও বর্তমানে সৈয়দ মেহেদী হাছান চৌধুরীর মাধ্যমে তা নতুন করে উজ্জীবিত হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন, কেবল অর্থ দিয়ে হারানো সম্মান ফেরানো সম্ভব নয়; মানুষের জন্য কাজ করা এবং সেবা প্রদানের মাধ্যমেই সত্যিকারের সম্মান অর্জিত হয়।
চৌধুরী তাঁর অসাধারণ মানবিকতা ও চারিত্রিক গুণাবলীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নবিত্ত মানুষদের পাশে তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করেও তিনি মাসে একবার বা দুইবার ফরিদগঞ্জে এসে সমাজসেবামূলক কার্যক্রম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত সহায়তা প্রদান করেন। তিনি এলাকার দুঃস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য খাদ্য, শীতবস্ত্র এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করছেন।
সম্প্রতি তিনি রূপসা জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর নামে একটি সেবামূলক ফাউন্ডেশন স্থাপনের উদ্যোগ করেছেন। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দান, শিক্ষাবৃত্তি এবং বিভিন্ন মানবিক সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সৈয়দ মেহেদী হাছান চৌধুরী বলেন, “আমার পূর্বপুরুষরা চাঁদপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল স্থাপন করে সুনাম অর্জন করেছেন। আমি এবং আমাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা সেই ঐতিহ্য বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।”শিক্ষানুরাগের ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষ উদ্যোগী। পৈতৃক ভিটার সামনে একটি দালান সংস্কার করে উপমহাদেশের ইসলাম ধর্মের প্রচারক, ঐতিহ্যবাহী জৈনপুরী পীর সাহেবদের জন্য একটি খানকা শরীফ তৈরি করেছেন। পাশাপাশি গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বৃত্তিমূলক তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে আর্থিক সমস্যার কারণে কারও শিক্ষাজীবন থেমে না যায়।
চৌধুরী ব্যক্তিগত জীবনে পারিবারিক ধর্মীয় মূল্যবোধকে গভীর শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। তাঁর জীবনযাপন অত্যন্ত সাদাসিধে ও বাহুল্যবর্জিত। সকল ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীলতার কারণে তিনি সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়।এটি সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষারও মূল ভিত্তি।শিক্ষা, মানবিকতা এবং সমাজসেবার মাধ্যমে সৈয়দ মেহেদী হাছান চৌধুরী রূপসা জমিদার পরিবারের হারানো গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছেন। তাঁর কর্মকাণ্ড প্রমাণ করছে, সত্যিকারের বিত্তের চেয়ে মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মান অনেক বেশি মূল্যবান।
এখানে উল্লেখ্য যে,জমিদার পরিবারের বংশানুক্রম অনুসন্ধানে জানা যায় যে “মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী ফাউন্ডেশনের “উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মেহেদী হাছান চৌধুরী হলেন মরহুম মোহাম্মদ গাজী চৌধুরীর কন্যা রতন বানুর চৌধুরানীর পুত্র ও ফরিদগঞ্জের লতিফগঞ্জ বাজারের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সৈয়দ আব্দুল লতিফ চৌধুরী ও মোহাম্মদ গাজী চৌধুরী পুত্র আহম্মদ গাজীর ৪র্থ কন্যা আয়েশা খাতুন চৌধুরীর বংশধর।
রূপসা জমিদার পরিবারের হারানো খ্যাতি আজ আর অতীতের গল্প নয়, এটি বর্তমানে এক অনুপ্রেরণামূলক মানবিক আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা ফরিদগঞ্জের সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে