বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৫৭ অপরাহ্ন
নুর মোহাম্মদ পাটোয়ারী :
হাজারো মানুষকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন হাজীগঞ্জের কৃতি সন্তান ও কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সাইফুল মালিক। প্রিয়জন, সহকর্মী ও অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষীকে অশ্রুসিক্ত করে অবশেষে নিজ গ্রামের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন তিনি। শেষ বিদায়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারি আর মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার ভোর ৬টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাইফুল মালিক। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে হাজীগঞ্জসহ কুমিল্লায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মরহুমের ছবি প্রকাশ করে হাজারো মানুষ শোক ও সমবেদনা জানাতে থাকেন।

মরহুমের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কয়েকদিন আগে তিনি ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। প্রথমে তাঁকে কুমিল্লা মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার গ্রিন লাইফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর বৃহস্পতিবার ভোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
মরহুমের মরদেহে বাদ জোহর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁর কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
বৃহস্পতিবার বাদ আসর তাঁর কর্মস্থল কুমিল্লায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে আসা হয় প্রিয় জন্মভূমি হাজীগঞ্জে। শুক্রবার বাদ জুমা হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও হাজারো মুসল্লি অংশ নেন। জানাজা শেষে চাঁদপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
এরপর সর্বশেষ নিজ গ্রাম হাজীগঞ্জ উপজেলার ৭নং পশ্চিম বড়কুল ইউনিয়নের নাটেহরা গাজী বাড়ি মসজিদে জানাজা শেষে মরদেহ দাফন করা হয়। এ সময় বাবা মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালামের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন সাইফুল মালিক। যেন জীবনের শেষ ঠিকানাতেও ফিরে গেলেন প্রিয় বাবার পাশে—চিরদিনের জন্য।
১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া সাইফুল মালিক ছিলেন ৩৪তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের একজন মেধাবী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০০৫ সালে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পুলিশে ৩৪তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
কর্মজীবনে সাইফুল মালিক ছিলেন একজন সৎ, বিনয়ী, মৃদুভাষী ও দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা। সহকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত আপনজন ও প্রিয় মুখ। তাঁর অকাল মৃত্যুতে পুলিশ বিভাগ, সহকর্মী, স্বজন ও এলাকাবাসীর মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, একমাত্র ছেলে ইলহান মালিক (১০), একমাত্র মেয়ে আয়রা মালিক (৫), মা, তিন ভাই ও এক বোনসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
হাজীগঞ্জ বাজারের ট্রাক রোড এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালামের সন্তান সাইফুল মালিকের আদি নিবাস হাজীগঞ্জ উপজেলার ৭নং পশ্চিম বড়কুল ইউনিয়নের নাটেহরা গ্রামে।
তাঁর চলে যাওয়া যেন মেনে নিতে পারছেন না কেউ। প্রিয় মানুষটির শেষ বিদায়ে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছেন হাজারো মানুষ। সাইফুল মালিক আজ নেই, কিন্তু তাঁর সততা, বিনয়, কর্মনিষ্ঠা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে মানুষের হৃদয়ে—হাজীগঞ্জের মানুষের স্মৃতিতে, সহকর্মীদের ভালোবাসায় এবং তাঁর রেখে যাওয়া অমলিন কর্মের মাঝে।