বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৩ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধিঃ
বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই। অন্য সময়ের তুলনায় শীত মৌসুমে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দেয়।
এ রোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু শিশুদের সাধারণত পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) রেখে চিকিৎসা করা হয়,অন্য সময়ের তুলনায় শীত মৌসুমে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দেয়। এ রোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু শিশুদের সাধারণত পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) রেখে চিকিৎসা করা হয়, যেটিকে বলা হয় শিশুদের আইসিইউ।
তবে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে স্থাপন করা হয়নি অত্যাবশ্যকীয় এ ইউনিট। বাধ্য হয়ে চিকিৎসকরা রোগীরদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠাচ্ছেন। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে গিয়ে কখনো কখনো শিশুর মৃত্যুও হচ্ছে। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক মাস থেকে ১২ বছর বয়সী মুমূর্ষু শিশুদের পৃথক পিআইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেয়া অত্যাবশ্যক। বরিশালে এ সেবা না থাকায় চিকিৎসকরা বাধ্য হয়ে রোগীদের ঢাকায় পাঠাচ্ছেন।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ৪৮ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ৩০০ শিশু। বহির্বিভাগে ২৩-৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ৩২৭ শিশু, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় দ্বিগুণ। শনিবার একদিনে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ১৯০ শিশু। এর মধ্যে নিউমোনিয়া, জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যাই বেশি।
বরিশাল নগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের মো. সাইফুল ইসলামের দেড় বছর বয়সী সন্তান নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। ভর্তি করান বরিশাল মেডিকেলে। সেখানে পাঁচদিন চিকিৎসার পর পিআইসিইউ বেডের জন্য দ্রুত ঢাকায় নিতে বলেন চিকিৎসক। ১০ হাজার টাকায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকা শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে সেখানে সিট না পেয়ে পড়তে হয় মহাবিপদে। বাধ্য হয়ে পাশে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে এক রাত চিকিৎসা করান। পরদিন বেলা ১১টায় শিশু হাসপাতালে পিআইসিইউ বেড পেয়ে ভর্তি করেন সেখানে। তবে রাতেই মারা যায় শিশুটি। সাইফুল ইসলামের মতো বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রতিদিনই দুই-একটি শিশুকে রেফার করা হয় ঢাকায়। এর অধিকাংশের সাইফুলের সন্তানের মতো ভাগ্যবরণ করতে হয়। আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে বেড়েছে ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপ।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি বেশির ভাগ রোগীই জ্বর, কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যা দ্বিগুণেরও বেশি। প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০ রোগী ভর্তি হচ্ছে, যার বেশির ভাগই শিশু। শীতের প্রকোপ বাড়লে রোগীর সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা।
তিন মাস বয়সী জুবায়েরের বেশ কিছুদিন থেকে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট। ভোলার ভেদুরিয়া থেকে বাবা মো. ইয়াছিন তাকে বরিশাল মেডিকেলে এনেছেন। তিনি বলেন, ‘বাড়িতেই শিশুর জ্বর আসে। পরে ভোলায় চিকিৎসা করান। তিনদিনেও না কমায় বরিশাল মেডিকেলে ভর্তি করান। পরীক্ষা করে জানা গেছে শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এখন চিকিৎসা চলছে। তবে একই অবস্থায় রয়েছে।’ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এতদিন পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে দৃষ্টি দেয়া হয়নি। নবজাতক ও প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের মৃত্যু কম হওয়ায় নজর এড়িয়ে গেছে। একজন শিশুর মৃত্যুও কাম্য নয় উল্লেখ করে সীমিত পর্যায়ে সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিআইসিইউ স্থাপন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন কারা।
মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘নিউমোনিয়া, জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট সাপোর্ট জরুরি। তবে আমাদের এখানে এটি নেই। বাধ্য হয়ে রোগীদের ঢাকায় রেফার করতে হয়। পরিবারের অসচেতনতার কারণেই বাড়ছে শিশুদের ঠাণ্ডাজনিত রোগ। শীত যত বাড়ছে রোগের প্রকোপও তত বাড়ছে। আমরা সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছি।’ এ বিষয়ে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে বরিশালে বাড়ছে ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। আমরা বিগত বছরগুলোর মতোই প্রকোপ বাড়লেও সেবার মান বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। শিশুদের সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি ও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে সংক্রমণ কমবে।
পেডিয়াট্রিক আইসিইউ বেডের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় একটি রুম পিআইসিইউ বেড স্থাপনের জন্য প্রস্তুত করেছি। তবে এখনো কোনো বরাদ্দ আসেনি। বরাদ্দ দিলেই তো হবে না, তার জন্য চিকিৎসক ও লজিস্টিক সাপোর্টও দিতে হবে। পরিপূর্ণ সাপোর্ট দিলে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে। বয়স্কদের জন্য এখানে লাইফ সাপোর্ট বা আইসিইউ রয়েছে। তবে চিকিৎসক ও লজিস্টিক সাপোর্ট নেই। এ কারণে আমরা রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছি না।