বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৪ অপরাহ্ন

নোটিশঃ
দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সাংবাদিক  নিয়োগসহ পরিচয় পত্র নবায়ণ চলছে।

কোয়ারেন্টিনের দিনগুলো এবং খাদ্যনিরাপত্তার ডায়েরি

প্রকৃতি আমাদের এই জেনারেশনকে বঞ্চিত করেনি। এবার আমাদের সামনে অনেক কিছু দেখার আছে। করোনাভাইরাসের সংকটে আমি রুটি বানানো শিখে গেছি। এ দেশের চাল হয় না, আমাদের দেশগুলো থেকেই আসে চাল, ডাল। যেহেতু যোগাযোগ বন্ধ, তাই চালের সংকট, রুটির আটাই ভরসা। ভারতের চাল, মসলা, কাঁচা মরিচ এখন আর নিয়মিত আসছে না। স্টুটগার্টের ইন্ডিয়ান দোকানে শুনেছি একজন করোনা রোগী পাওয়া গিয়েছিল, তাই দোকান লকডাউন।

লন্ডনে এখনই খাবারের দাম তিন চার পাঁচ গুণ বেড়ে গেছে। আমাদের এখানে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ বলে বাজারে চাল আর কাঁচা মরিচের সংকট। জার্মানিতে যদিও বাজারে লোকাল খাবার আছে এখনো প্রচুর, তাই দাম বাড়েনি। কিন্তু এখানে ফলমূল যেমন কলা, শাকসবজি আসে স্পেন, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে। স্পেনের যে অবস্থা, এরপর শাকসবজি আর খাবার কত দিন আসবে, সেটাই প্রশ্ন! মাঝেমধ্যে দু-একটা চালান যা আসে, সেটা আবার সময়মতো না গেলে আর পাওয়া যায় না। আমাদের এখানে পরিবেশবাদীদের ক্যাম্পেইন ছিল; Eat regional, eat local. কেননা অনেক দূর-দূরান্ত থেকে পৃথিবীর একেক প্রান্ত থেকে খাবার আনতে অনেক কার্বন বা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ঘটে। সেটাও করোনাভাইরাস-পরবর্তী সময়ে মানুষের ভাবতে হবে আবার।

জার্মানিতে একটা নিউজ দেখলাম করোনাভাইরাস-পরবর্তী সময়ে এরা গাড়ি নয় বরং কৃষিতে মনোযোগ দিতে চায়।

হ‌ুমায়ূন আহমেদের ‌‘অয়োময়’ নাটকে মহামারির দৃশ্য দেখেছিলাম। গুটিবসন্তের ভাইরাসকে ডাকা হতো শীতলাদেবী, যে বাড়িতে শীতলাদেবী ঢোকে, সে বাড়ি ছারখার করে দিয়ে যায়। ইতালির পর নিউইয়র্কে এখন শীতলাদেবীর অবস্থান। নিউইয়র্ক আর ইতালিতে পরিচিত যারা আছে, এদের মনের অবস্থা আর পরিবারের অবস্থা কেমন, সহজেই অনুমান করা যায়। নিউজগুলো দেখে দূর থেকেই রাতে ঘুম আসে না। এ জন্য মোবাইল ফেসবুক নিউজ সব মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকে। শীতলাদেবীর প্রস্থান-পরবর্তী সংকট পৃথিবীর মানুষ কীভাবে সামাল দেবে, জানি না।

ইংল্যান্ড তাজা খাবার, ফলমূল, শাকসবজির জন্য আশপাশের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। স্পেন, ইতালির করোনার ভগ্নদশার প্রভাবে ইংল্যান্ডের বাজারে খাবারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। আর বাকিদের অতিরিক্ত কেনাকাটার জন্য বাজারের তাক খালি। লন্ডনে প্রাইমারি স্কুলের একজন বান্ধবী থাকে, সে ‘আমি কেমন আছি জানতে খোঁজ করেছিল, বলেছিল ওদের খাবার নেই বাজারে।’ কিছুদিন পর আমি খোঁজ নিলাম খাবার পেয়েছে কি না জানতে, উত্তর এল, ‘তার ভাই আইসিইউতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত।’

ইতিমধ্যে চাকরির ছাঁটাই শুরু হয়ে গেছে। আশপাশের দুজনের চাকরি চলে গেছে। সকালে একটা জার্মান ফ্রেন্ড কল দিয়ে বলল চাকরি চলে গেছে। ওদের অফিসে শতভাগ ছাঁটাই মানে অফিস আর চলবে না। আগামী দুই বছর এ রকম অর্থনৈতিক মন্দা থাকবে, আরও বেশিও হতে পারে। সে তার দাদির কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের অর্থনৈতিক মন্দার গল্প শুনেছে। সেই গল্প বলল, আমিও সেসব গল্প শুনেছি আমার এক জার্মান শিক্ষকের মুখে। তখন তিনি শুধু আটা সেদ্ধ করে বাচ্চাদের খেতে দিয়েছেন। ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত মন্দা অর্থনীতিতে, খাবারের তীব্র সংকটে আমেরিকা তখন প্রথম মোড়ল হিসেবে আবির্ভূত হয় (জেনেটিক্যালি মডিফাইড গম) খাদ্য নিয়ে। এবার হয়তো আমেরিকার নিজেকে রক্ষা করতে হলে অন্য দেশের সাহায্য দরকার।

ইউরোপের আগে কোনো দিন কেউ এ রকম ইস্টার দেখেনি। এখন হয়তো অনেক লাক্সারি প্রজেক্ট বাতিল হয়ে যাবে, মিলিয়নিয়াররা দায়গ্রস্ত হবে, স্কলারশিপের ফান্ড কমে যাবে প্রথম ধাক্কায়। কিন্তু ভাইরাস ইমুউনিটি নিয়ে গবেষণার ফান্ড শুরু হয়ে গেছে।

এরা উন্নত দেশ, এদের অনেক রকম ফান্ড আছে, পরিকল্পনা আছে, বেকার ভাতা আছে, অবশ্য যদিও সেটা তাদের নাগরিকদের জন্য। গতকাল (১০ এপ্রিল) একজন পাকিস্তানি মেয়ে এসেছিল, কোনো টাকা নেই। বাংলাদেশের জার্মান অ্যালামনাই গ্রুপে অনেক অ্যাপ্লিকেশন এসেছে ফান্ডের জন্য, লেখা ছিল কারও কারও দু-এক সপ্তাহের বেশি খাবারের টাকা নেই।

কিন্তু বাংলাদেশ কি সব পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে?

ব্যবসায়ীদের হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে যাচ্ছে! পোশাক কারখানার শত শত অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে, যাচ্ছে, যাবে। অনেকে আর চাকরি ফেরত পাবে না, চাকরি হারাবে।

বাংলাদেশ ২০১৭-এর বন্যা-পরবর্তী চালের বাজার পরিস্থিতিই সামাল দিতে পারেনি, বন্যায় চালের দাম বেড়েছিল। ২০১৯-এ পেঁয়াজের সংকট এবং পেঁয়াজের দাম নিয়েও তো প্রচণ্ড অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। এখন যদি মাঠের ধান না কাটা যায়, কিছুদিন পর বন্যা আসবে, পানিতে এমনিতেই সব তলিয়ে যাবে। খামারিদের গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগির খাবারের চালান বন্ধ। বেশি দামে খাবার কিনলেও পশুর খাবারের সংকট, সুতরাং মাছ-মাংসের বাজারেও দাম বাড়বে অচিরেই। গরুর দুধ নিয়ে গ্রামের কৃষক বিপাকে, শহরে চালান বন্ধ।

স্বাভাবিক অবস্থাতেই সরকার পলিসির ব্যর্থতার কারণে খাবারের বাজার সামাল দিতে পারে না। সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে বাংলাদেশের করোনা।

যেই করোনাভাইরাস শুরুতে বিমানবন্দর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যেত, সেটা তাদের বাধ্য করা যেত, কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক পলিসির অভাবে এখন সরকার পরিস্থিতি লেজেগোবরে করে ফেলেছে।

কত দিন এই লকডাউনে মানুষ থাকতে পারবে!

যাদের এখনো অনেক লোভ, দুস্থ ভাতার টাকা লুটপাট করে গোডাউন ভরছে, দুর্নীতির অনেক টাকা! এরা কি জানে যে প্রথম ধাক্কায় অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব দিনমজুর, কৃষক, শ্রমিকদের ওপর গেলেও সেটার প্রভাব অল্পদিনের ভেতরেই শহরেও আসবে। কৃষক-শ্রমিকেরা না খেয়ে মরে গেলে কে শহরের লুটেরাদের প্লেটে খাবার এনে দেবে? শহরে তো কোনো ধানখেত নেই, ফসল নেই, ডিম- দুধ নেই, শাকসবজি নেই, মানুষ কী খাবে? মানুষ কি টাকা খেতে পারবে?

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কি যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া আছে!

এবারে যখন অনেক ধানের ফলন হয়েছিল, তখন অভিমানে অনেক কৃষক ফসল আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, কারণ বাজারে কম দাম ছিল, সেটাও মজুতদারদের একচেটিয়া বাজার দখলের কারণে। তখন সরকারের পলিসির ব্যর্থতায় বাজারে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাননি, ফলে অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে দিয়ে রিকশা চালাতে ঢাকায় এসেছিলেন।

একজন রিকশাওয়ালার পিঠে লেখা দেখেছিলাম,

‘করব না আর ধানের চাষ,

দেখব তোরা কী খাস!

একদিন হয়তো আবার ভোর হবে, হয়তো সেদিন পৃথিবী থেকে করোনা বিদায় নেবে। সেদিন একটা নতুন পৃথিবী হবে। সেই পৃথিবীতে মানুষ হয়তো অনেক বদলে যাবে, একটা নতুন সকাল হয়তো হবে আবার!

সেই ভোরের অপেক্ষায়!

নিউজটি শেয়ার করুন

All rights reserved © meghnapost.com